October 18, 2021, 3:31 am
তাঁজাখবর
শাজাহানপুরে ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী ভোটার তালিকায় মৃত বগুড়ায় বিষপানে প্রেমিকার আত্মহত্যা, প্রেমিকের আত্মহত্যার চেষ্টা শাজাহানপুর থানা পুলিশ কর্তৃক ১০ কেজি গাঁজা উদ্ধার কাজিপুরে জলবায়ু পরিবর্তন বাস্তুচ্যুতি এবং অভিবাসন বিষয়ক বহু-অংশীজনের সংলাপ উজিরপুরে বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও র‌্যালি অনুষ্ঠিত শাজাহানপুরে পুজা মন্ডপ পরিদর্শন করলেন বিএনপি নেতা এনামুল হক শাহীন ধুনটে দুর্গা উৎসবে অর্থ সহায়তা দিলেন এমপি হাবিব ও পুত্র সনি শাজাহানপুরে পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীর দুর্গামন্ডপ পরিদর্শন বগুড়ার শেরপুরে বিদ্যুৎস্পর্শে ৪ জনের মৃত্যু : বগুড়ায় এক ঘণ্টার জন্য ডিসি কলেজছাত্রী আফিয়া

কম্বল পাইছিলাম দুইটা, তা-ও নিয়ে গেছে চোরে‌

সংবাদদাতার নাম:
  • প্রকাশিত: বুধবার, জানুয়ারি ৬, ২০২১
  • 34 দেখা হয়েছে:

ষ্টাফ রিপোর্টার

আমি মিথ্যা কথা বলবো না। দুইটা কম্বল পাইছিলাম। কিন্তু তা-ও চোরে নিয়ে গেছে। এখন ছেড়া কম্বল বিছিয়ে চাদর গায়ে দিয়ে বসে আছি। ‌কেউ সাহায্য করলে আমার জন্য না হলেও আমার এই মেয়ে ও নাতনিটা শী‌তে কষ্ট পাইতো না।’

শতবর্ষী এক বৃদ্ধের আক্ষেপ ও আকুতি ঘেঁষা এই কথাগুলো শুনতে শুনতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতার শেষ লাইন ক’টি ঘুরেফিরেই মনে পড়ছিল- “শ্রাবণগগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে/ শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি, যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী”।

চারপাশে কনকনে শীত। হাড় কাঁপুনি বাতাস বইছে। তখন রাত প্রায় দশটা। রাত যত গভীর হচ্ছে শীতের তীব্রতা তত বাড়ছে। রাজধানীর হাইকোর্ট এলাকায় জাতীয় ঈদগার মূল ফট‌কের পা‌শেই এক নারী কিছু কাঠ দি‌য়ে আগুন জ্বালা‌নোর চেষ্টা কর‌ছেন। কা‌ছে যেতে যেতে ততক্ষণে দেয়াশলাই দি‌য়ে আগুন জ্বালিয়ে ফেলেছেন। তার পা‌শেই চাদর গা‌য়ে ব‌সে আছেন এক বৃদ্ধ ও শিশু। তা‌দের সা‌থে কথা বলে জানা যায়, ওই নারীর নাম শিল্পী। শীতের পোশাক না থাকায় আগুন জ্বা‌লি‌য়ে শীত নিবার‌ণের এই ব‌্যবস্থা তার।

শিল্পী  ব‌লেন, ‘আমার বাবা-মা নাই। স্বামী আছে, তবে সে পাগল। তাই আমা‌দের দেখাশোনা ক‌রে না। উকিল (ধর্ম বাবা) বাবা পান সিগা‌রে‌টের দোকান ক‌রে যা কামাই করে, তা দি‌য়েই এক বেলা তিন জন খে‌তে পা‌রি।’

তি‌নি আরও ব‌লেন, ‘এই বাবাই আমা‌কে মানুষ ক‌রে বি‌য়ে দি‌য়ে‌ছি‌লেন। স্বামী তো পাগল তাই আমা‌দের এখন দে‌খে না। আগে মান‌ুষের বা‌ড়ি‌তে বুয়ার কাজ করতাম, ক‌রোনার কার‌ণে কাজ বাদ দি‌য়ে‌ছিলাম। কিন্তু এখন আর কেউ কা‌জে নেয় না। ছোট একটা মে‌য়ে তা‌কে নি‌য়ে কই যা‌বো, কি কর‌বো কিছুই বুঝ‌তে পার‌ছি না। ভিক্ষা কর‌তে গে‌লেও কেউ ভিক্ষা দেয় না। সবাই ব‌লে জোয়ান মানুষ কাজ ক‌রে খান, কিন্তু কাজ তো পাই না। এখন বাবাই আমা‌দের‌ দেখাশোনা ক‌রেন, সবাই মি‌লে রা‌তে রাস্তায়ই থা‌কি।’

আরেকটু এগিয়ে কা‌ছে গি‌য়ে সেই বৃদ্ধ উকিল বাবার সঙ্গে কথা হয়। উনার নাম আব্দুর রহমান। কথা বলে জানা যায়, শিল্পী তার নি‌জের মে‌য়ে না। উকিল মে‌য়ে। তারা সমস‌্যায় আছে ব‌লে সাহায্যের জন‌্য এগি‌য়ে এসেছেন।

তি‌নি ব‌লেন, ‘আমার বয়স ১০৪ বছর। আমার নাম আব্দুর রহমান, বাড়ি চাঁদপুর। বাড়িঘর জমিজমা সব নদীতে ভেঙে গেলে ঢাকায় আসি। প্রথমে বাড়ির কেয়ারটেকার কাজ করতাম এখন পান সিগারেট বিক্রি করি।’

‘নদীতে সব নিয়ে গেছে। তারপরে ঢাকায় আসি মানুষের বাড়ির কেয়ারটেকারের কাজ করি। দিন ভালই যাচ্ছিল। আমার ছেলেটা এক্সিডেন্ট করে মারা যায়। পরে আমার স্ত্রীও মারা যায়। আমি একা হয়ে যাই। প্রায় পাগলের মতোই ঘুরে বেড়াতাম। পরে আমি চিন্তা করি, যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন যাদের কেউ নেই তাদের সাহায্য করবো। সেই থেকে রাস্তার ছেলে-মেয়ে, যাদের বাবা-মা কেউ নেই, তাদেরকে মানুষ করার চেষ্টা করি, বড় করে বিয়ে দিয়ে দিই’- জানা যায় আব্দুর রহমানের কথা।

এখন পর্যন্ত রাস্তা থেকে তুলে এনে এরকম কতজনকে মানুষ করেছেন- জবাবে এই স্বনির্ভর বৃদ্ধ বলেন, ‘এযাবৎ আটটা মেয়েকে পাইছিলাম। তাদের মানুষ করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। একটা ছেলে পাইছিলাম, এক ডাক্তার নিয়া গেছে, সেই পড়াশোনা করাচ্ছে।’

এই মেয়েগুলো কোথায় পেয়েছিলেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এক মাস দুই মাস বয়স থাকা অবস্থায় অনেককেই ময়লা-আবর্জনার মধ্যে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। সেখান থেকে তাদের নিয়ে গিয়ে আমি মানুষ করে পরবর্তীতে বিয়ে দিয়েছি।’

রাস্তায় থাকেন, কেউ কোনও সাহায্য করে না? আব্দুর রহমান লম্বা শ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমি মিথ্যা কথা বলবো না। দুইটা কম্বল পাইছিলাম। কিন্তু চোরে নিয়ে গেছে। এখন ছেড়া কম্বল বিছিয়ে চাদর গায়ে দিয়ে বসে আছি। ‌কেউ সাহায্য করলে আমার জন্য না হলেও আমার এই মেয়ে ও নাতিনটা শী‌তে কষ্ট পাইতো না।’

উকিল মেয়ের শিল্পীর স্বামী অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিল্পীকে আমি বিয়ে দিয়েছিলাম। জামাইটা পাগল, আমার এই উকিল মেয়ে ও নাতিনকে সে দেখাশোনা করে না। এখন তারা রাস্তায় থাকবো এটা আমার সহ্য হয় না। আর আমারও তো ক্ষমতা নাই তাদের বাসা ভাড়া করে রাখবো। তাই তাদেরকে নিয়েই রাস্তায় আছি। তা‌দের কে তো আর একা ছাড়‌তে পা‌রি না।’

‘আমি পান সিগা‌রেট বি‌ক্রি ক‌রি। আজ সারাদিনে পান সিগারেট বিক্রি করে ১০০ টাকা লাভ হয়েছিল। তার মধ্যে ৫০ টাকা দিয়ে দুপুরে তিনজন খেয়েছি। আর রাতে ৫০ টাকা দিয়ে তিনজন খেয়েছি’- বলেন তিনি।

আপনার তো বয়স অনেক, এই বয়সের চে‌য়ে অনেক কম বয়‌সের মানুষ ভিক্ষা ক‌রে, আপ‌নি তা না করে পান সিগা‌রেট বি‌ক্রি ক‌রেন কেন? শতবর্ষী এই বৃদ্ধ বলেন, ‘এখনও আমি চল‌তে পা‌রি, তাই ভিক্ষা কর‌বো কেন! যত কষ্টই হোক, কর্ম ক‌রে খা‌বো।’

উকিল মেয়ে কোনও কাজ করে কিনা জানতে চাইলে আব্দুর রহমান বলে, ‘সে-ও আগে বাসাবাড়ির কাজ করতো। করোনা আসার পরে বাসাবাড়ির কাজ করা বন্ধ হয়ে যায়। এখন আর কোনও বাসার মালিক তাকে কাজে নেয় না। এদিকে আমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত তাদেরকে ভিক্ষা করতে দেবো না। তাই যে কয় টাকা কামাই করি তিনজনে ভাগ করে খাই।’

সরকা‌রের কা‌ছে কোনও সাহায‌্য চান কিনা? আব্দুর রহমানব‌লেন, ‘আমি কা‌রেও কা‌ছে ভিক্ষা চাই না। আমি শেখ হাসিনার কা‌ছেও ভিক্ষা চাই না। ‌কিন্তু আমি নৌকায় ভোট দেই, যত‌দিন বেঁচে আছি দে‌বো। শেখ হা‌সিনাকে দে‌খে নৌকায় ভোট দেই না। আমি ভোট দেই বঙ্গবন্ধু‌কে দে‌খে।’

‘য‌দি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাক‌তেন তাহ‌লে হয়তো আমরা রাস্তায় থাকতাম না’- তার একটুকু কথাতেই যেন জীবনের সব না-পাওয়া ও আক্ষেপ ঝরে পড়ে।

আব্দুর রহমান দুঃখ প্রকাশ ক‌রে ব‌লেন, ‘কত মানুষ কম্বল পায়, কত কিছু পায়, আমি কিছুই পাই না। দুইটা পাইছিলাম তাও চো‌রে নি‌য়ে গে‌ছে! আমারে নি‌য়া চিন্তা ক‌রি না, চিন্তা ক‌রি শুধু না‌তিনটারে নি‌য়া, সে ছোট মানুষ, শীত সহ‌্য কর‌তে পার‌বো না।’

সি/বি

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরো সংবাদ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। © All rights reserved © 2020 ABCBanglaNews24
Theme By bogranewslive
themesba-lates1749691102